■ হরপ্পা সভ্যতার বৈশিষ্ট্য
(১) সমসাময়িক যুগে মিশর বা মেসোপটেমিয়াতে যে সভ্যতার উন্মেষ হয়েছিল প্যাপিরাস, পোড়ামাটি ও পাথরের বুকে তার লিখিত বিবরণ পাওয়া যায়। পণ্ডিতরা সেগুলি পাঠ করে তার ইতিহাস রচনা করেছেন। সিন্ধু উপত্যকার সিলমোহর ও বিভিন্ন পাত্রের প্রাগৈতিহাসিক ও তাম্র-প্রস্তর যুগের সভ্যতা গায়ে বেশ কিছু লিপি খোদাই করা আছে। সেগুলির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পণ্ডিতরা তাই বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যথা—ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, বাসনপত্র, অস্ত্রশস্ত্র এবং মানুষ, পশুপক্ষী ও দেবদেবীর মূর্তির ওপর ভিত্তি করে হরপ্পা সভ্যতার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। এই কারণে এই সভ্যতাকে প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা বলা হয়। (২) এই যুগে মানুষ লোহার ব্যবহার জানত না। এ সময় পাথরের ব্যবহার কমে আসতে থাকে এবং ব্রোঞ্জ ও তামার ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। পাথরের হাতিয়ার ও সরঞ্জামের পাশাপাশি ব্রোঞ্জ ও তামা ব্যবহারও চলতে থাকে। তাই এই সভ্যতা তাম্র-প্রস্তর যুগের সভ্যতা। (৩) সুমের, আক্কাদ ব্যাবিলন ও মিশর প্রভৃতি বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলির মত হরপ্পা সভ্যতাও ছিল নদীমাতৃকনদীমাতৃক সভ্যতা.
নগর সভ্যতা
সভ্যতা। (৪) সিন্ধুনদকে কেন্দ্র করে সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতা গড়ে ওঠে। কেবলমাত্র সিন্ধু উপত্যকাই নয়—সিন্ধুতট অতিক্রম করে পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, রাজপুতানা, গুজরাট, সৌরাষ্ট্র এবং নর্মদা উপত্যকার এক বিস্তীর্ণ স্থানে এই সভ্যতা বিস্তৃত হয়েছিল। উত্তরে জম্মু থেকে দক্ষিণে নর্মদা উপত্যকা এবং পশ্চিমে বেলুচিস্তানের মাকরাণ মরু-উপকূল থেকে উত্তর-পূর্বে মীরাট পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি ছিল। পুরো এলাকাটি ছিল একটি ত্রিভুজের মত এবং এর আয়তন হল প্রায় ১৩ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে এলাকাটি প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়ার চেয়ে বেশ কয়েক গুণ বড়। (৫) বর্তমানে হরপ্পা সভ্যতার প্রায় ২৫০টি কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে এবং এগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি কেন্দ্র শহর নামের অধিকারী। নগর-কেন্দ্রগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হল হরপ্পা ও মহেঞ্জোদরো। এই নগরী দু'টির মধ্যে দূরত্ব প্রায় ৪৮৩ কিলোমিটার। এছাড়া, চান্দড়ো, কোটদিজি, রূপার, আলমগীরপুর, লোথাল, রংপুর, রোজদি, সুরকোটরা, কালিবঙ্গান, বনওয়ালি প্রভৃতি স্থানে উন্নত নগর জীবনের নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। (৬) প্রায় তের লক্ষ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত এই এলাকাটিতে সর্বত্রই একই ধরনের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়েছে। এই সভ্যতার সর্বত্রই একই ধরনের নগরীগুলির অবস্থানগত দূরত্ব যথেষ্ট, কিন্তু এ সত্ত্বেও নগরীগুলির জীবনযাত্রা পরিকল্পনা, গঠন-রীতি ও জীবনযাত্রার উপকরণে যথেষ্ট মিল আছে। সুতরাং একটি নগর সম্পর্কে আলোচনা করলেই অন্যান্য নগর সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারণা করা যায়। এখানে মহেঞ্জোদরো শহরটি সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।
নগর পরিকল্পনা : মহেঞ্জোদরো শহরটির পশ্চিমদিকে প্রায় চল্লিশ ফুট উঁচু একটি বিশালায়তন ঢিপির ওপর একটি দুর্গ ছিল। এই দুর্গ অঞ্চলে কিছু ঘরবাড়িও আবিষ্কৃত দুর্গ, স্নানাগার ও শস্যাগার হয়েছে। মনে হয়, সেগুলি শাসকদের বাসস্থান। দুর্গ অঞ্চলেই সর্বসাধারণের ব্যবহারোপযোগী একটি বিরাট বাঁধানো স্নানাগার আবিষ্কৃত হয়েছে। তার আয়তন দৈর্ঘ্যে ১৮০ ফুট ও প্রস্থে ১০৮ ফুট। এর চারদিক ঘিরে আছে ৮ ফুট উঁচু ইটের দেওয়াল। এর কেন্দ্রস্থলে আছে একটি জলাশয়,যা ৩৯ ফুট লম্বা, ২৩ ফুট চওড়া এবং ৮ ফুট গভীর। জলাশয়ের নোংরা জল নিকাশ ও তাতে পরিষ্কার জল পূর্ণ করার ব্যবস্থা ছিল। ঋতুভেদে জল গরম বা ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থাও ছিল। এরই পাশে ছিল একটি কেন্দ্রীয় শস্যাগার। এর আয়তন ছিল দৈর্ঘ্যে ২০০ ফুট এবং প্রস্থে ১৫০ ফুট। ডঃ এ. এল. ব্যাসাম এটিকে রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কের সঙ্গে তুলনা করেছেন। স্যার মাটিমার হুইলার বলেন যে, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের পূর্বে এ ধরনের বিশাল শস্যাগার পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায়নি। এই অঞ্চলের অন্যান্য বড় বড় বাড়ির ধ্বংসাবশেষকে পণ্ডিতরা সভাকক্ষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমিতিগৃহ বলে চিহ্নিত করেছেন।
দুর্গ-অঞ্চলের এই উঁচু ঢিপির পূর্বদিকে নিচু জমিতে মূল শহরটি গড়ে উঠেছে। নগরের উত্তর থেকে দক্ষিণ এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমদিকে সমান্তরালভাবে কয়েকটি রাস্তা চলে গেছে। রাস্তাগুলি ন’'ফুট থেকে ত্রিশ ফুট চওড়া। এই রাস্তাগুলি থেকে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য গলি। গলিগুলির দু'পাশে নাগরিকদের ঘরবাড়ি। বাড়িগুলি পোড়া-ইটের তৈরি এবং অনেক বাড়িই দো-তলা বা তিন-তলা। প্রত্যেক বাড়িতে প্রশস্ত উঠোন, স্নানাগার, কুয়ো ও নর্দমার ব্যবস্থা ছিল। অনেক বাড়িতে আবার ‘সোকৃপিট' ছিল। বাড়ির নোংরা জল নর্দমা দিয়ে এসে রাস্তার ঢাকা দেওয়া বাঁধানো নর্দমায় পড়ত। নর্দমাগুলি পরিষ্কারের জন্য ইট দিয়ে তৈরি ঢাকা ‘ম্যানহোল'-এর ব্যবস্থা ছিল। ডঃ এ. এল. ব্যাসাম বলেন যে, রোমান সভ্যতার পূর্বে অপর কোন প্রাচীন সভ্যতায় এত পরিণত পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা ছিল না। প্রত্যেক বাড়ির সামনে বাঁধানো 'ডাস্টবিন' ছিল।
কেবলমাত্র বড় রাস্তার ওপরেই শহরের দোকানগুলি অবস্থিত ছিল। শহরের উত্তর-পূর্ব কোণে সারিবদ্ধভাবে ছোট ছোট কিছু কুঠুরি ঘর ছিল। মনে হয়, এগুলি দরিদ্র ও শ্রমজীবী
> "No other ancient civilization until that of the Romans has so efficient a system of drains." The Wonder That was India, Basham P. 16.
মানুষদের বাসস্থান। অধ্যাপক গর্ডন চাইল্ড বলেন যে, হরপ্পার পৌরশাসকরা গৃহ-নির্মাণ সংক্রান্ত আইন-কানুন মেনে চলতেন। খননকার্যের ফলে মহেঞ্জোদরোতে সভ্যতার ন'টি স্তর আবিষ্কৃত হয়েছে, অর্থাৎ
ধারাবাহিকতা ধ্বংসের পর সেখানে আটবার সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। হরপ্পায় ছ'টি স্তর আবিষ্কৃত হয়েছে। এই ছ'টি বা ন'টি স্তরের সর্বত্র মানুষের জীবনযাত্রা প্রণালী বা নগর পরিকল্পনা কিন্তু একই ধরনের—কোথাও কোন পরিবর্তন ঘটেনি, তবে ওপরের স্তরগুলিতে নগর কর্তৃপক্ষের অপদার্থতার ছাপ স্পষ্ট। দেখা যাচ্ছে যে, ওপরের স্তরের ঘরবাড়িগুলি ক্রমশ রাস্তা দখল করছে, গলি ছোট হয়ে আসছে, নর্দমা বুজে আসছে। এ সত্ত্বেও, নগর পরিকল্পনা ও জীবনাযাত্রার ধারা কিন্তু একই রকম। এই নগরগুলিতে কি ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল
সে সম্পর্কে কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। এ ব্যাপারে পণ্ডিতরা নানা মতামত প্রকাশ করেছেন। কোন কোন ইওরোপীয় রাজনৈতিক জীবন পণ্ডিতের মতে, হরপ্পার নগর দুর্গে একজন শাসক বা রাজা বাস করতেন। দুর্গসংলগ্ন শস্যাগার তাঁর ধনসম্পদের পরিচয় দেয়। ভারতীয় পণ্ডিত কোশাম্বী-র মতে এটি নিছক অনুমান মাত্র—এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। তাঁর মতে, রাজতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র—যাই হোক না কেন, এখানে একটি কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল, নতুবা এত উন্নত ও পরিকল্পিত নাগরিক সভ্যতার বিকাশ এখানে সম্ভব হত না। অনেকের মতে বণিকদের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রজাতান্ত্রিক শাসন এখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল। স্যার মার্টিমার হুইলার-এর মতে, সিন্ধু অঞ্চল ছিল একটি সাম্রাজ্য এবং এর কেন্দ্রে ছিলেন একজন পুরোহিত-রাজা। তিনি দৈব-অধিকারের জোরে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। এইচ. ডি. শাঙ্খালিয়া এর মতে, এখানকার কেন্দ্রীয় শাসন ছিল একজন দৃঢ়, উদারনৈতিক স্বৈরশাসকের হাতে।
0 Comments